• Blogs
  • BCS Learning Center
  • ৩৭ তম রিটেন প্রস্তুতিঃ কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক

৩৭ তম রিটেন প্রস্তুতিঃ কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক

(-কৃষিবিদ কাওছার হোসেন)

কাকিলা মাছের মত লম্বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ--পূর্ব দিক বরাবর পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি।Google Map এ রাষ্ট্রটি খুঁজে নিয়ে একটু Magnify করলে চোখে ভাসবে কাকিলা মাছের মত দেশটির অবয়বটি। দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মাছটির মাথা কল্পনা করলে উত্তর-পশ্চিমে পড়ে মাছটির লেজ। লেজের যে অঞ্চলটিতে পাখনা থাকবার কথা সেই কিনারায় দেশটির রাজধানী অবস্থিত।

দেশটির দক্ষিণে জ্যামাইকা ও হাইতি, উত্তরে অামেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য এবং পূর্বে ইতিহাস বিখ্যাত টার্কস দ্বীপপুঞ্জ।

১৯৫৯ সালে দেশটির নেতৃত্বে ছিল বাতিস্তা সরকার। জানেন তো বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। বীর ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি বাতিস্তা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে একদলীয় কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতার মসনদে বসে। তখন থেকেই দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান ক্যাস্ত্রো এবং নীতিবিষয়ক সব রকম সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ব্যক্তি। ক্যাস্ত্রোর বিপ্লবী চরিত্র সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।

ক্যাস্ত্রো ১৯৬০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের কৈশরকালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বিশ্বের প্রধান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং মার্কিন বিরোধী ভূমিকা অব্যাহত রাখেন। এটিই মার্কিনীদের সাথে দেশটির চরম বৈরিতার অন্যতম প্রধান কারণ । এছাড়াও পালোয়ান ক্যাস্ট্রো নিজ রাষ্ট্রের নিকটবর্তী মার্কিন মালিকানাধীন সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করেন। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেকোন আমদানি-রপ্তান পণ্যের ওপর ক্যাস্ট্রো প্রশাসন অধিকতর কর বসান।

কথায় অাছে ইট মারলে, পাটকেল টি খেতে হয়। তার উপর পরবি তো পর, একে বারে মালির ঘাড়ে?

১৯৬১ সালে ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি সরকারিভাবে মার্কসবাদ গ্রহণ করে। স্নায়ুযুদ্ধের এক চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে নাকের ডগায় কমিউনিস্টরা যখন ক্ষমতায় এলো, তারপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে চরম বৈরী সম্পর্ক অারো শক্ত হলো। দেশটিতে ভাড়াটে সৈন্য পাঠিয়ে একাধিকবার সামরিক অভিযানের চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র। ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টাও হয় একাধিকবার। মার্কিন সিনেটের এক তদন্তে স্বীকার করা হয়, ১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে ফিদেল কাস্ত্রোকে কমপক্ষে আটবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। সিনেটের ফ্রাঙ্ক চার্চের নেতৃত্বে পরিচালিত সেই তদন্তে জানানো হয়, ক্যাস্ত্রোকে হত্যার জন্য তাকে ভয়াবহ বটুলিনাম টক্সিন ভরা সিগার পাঠানো হয়। এমনকি বলপয়েন্ট কলমে হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ লুকিয়ে রেখেও তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এসব গোপন চেষ্টার পাশাপাশি একপর্যায়ে প্রকাশ্যে রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। তাঁরা রাষ্ট্রটির প্রধান রপ্তানী পণ্য চিনি আমদানি বন্ধ করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু চিনি আমদানি বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং সাথে প্রায় সকল ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়। প্রেসিডেন্ট কেনেডি দেশটির বিরুদ্ধে পূর্ণ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও জারি করেন।

এখানেই শেষ নয়। অারও অাছে ----

• এ প্রতিকূলতার অশুভলগ্নে রাষ্ট্রটির সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্ক জোরদার করে।

• ১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

• ১৯৬১ সালের মাঝামাঝি সময় ‘'পিগস উপসাগর অভিযান'’ নামে কথিত CIA পরিচালিত তৎপরতা ক্যাস্ট্রো সরকার ও জনগণকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফিডেল ক্যাস্ট্রো নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে গোপন যোগসাজশে লিপ্ত হন। ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশটির ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল স্থাপন করে। মূল মার্কিন ভূখণ্ড থেকে মাত্র ১০০ মাইল দূরে স্থাপিত ঐ ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন সরকার ও জনগণকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। তারা অনতিবিলম্বে ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহারে আহ্বান জানায়। এতে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ অনমনীয় মনোভাব দেখায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি নৌবাহিনীকে কিউবা ঘিরে ফেলার নির্দেশ দেন। কিউবা যাতে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নৌ অবরোধের ফলে মার্কিন দাবি মেনে নেয় সেই উদ্দেশ্যে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। দুই পরাশক্তির জেদাজিদির কারণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

• দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে আর একটি বিব্রতকর বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রাষ্ট্রটিকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র বলে অভিহিত করা হয়। ২০১৫ সালের মে মাসে রাষ্ট্রটি কতিপয় মানবাধিকার অনুকূল ব্যবস্থা নিলে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে দেশটিকেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র ।

বড়র পিরীত বালির বাঁধ,
ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণেকে চাঁদ।

তবে, শক্তি ও অাত্মমর্যাদার প্রশ্নে দুদেশই এখানে বড়। তাই বোঝা মুশকিল উভয়ের মত ও মতভেদ। তবে অাপাদত উভয়ের বাতচিৎ - এ সম্পর্কের অম্ল-মধুরতা সুস্পষ্ট। বিপ্লবী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিডেল ক্যাস্ট্রো জাতির উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। এতে দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে তিরস্কার ও সমালোচনা রয়েছে।

এদিকে জন কেরি দূতাবাস উদ্বোধন উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতায় কিউবায় ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। জন কেরি বলেন, এ বিষয়ে মার্কিন নীতি পরিবর্তনের মানে এই নয় যে দেশটির রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়ে ওয়াশিংটন চুপ মেরে যাবে। তিনি বলেন, ‘'কিউবার নেতাদের এবং কিউবার জনগণের আরও জানা উচিত, গণতান্ত্রিক নীতি ও সংস্কারের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই চ্যাম্পিয়ন থাকবে।’

২০ জুলাই, ২০১৫, ওয়াশিংটনে কিউবার পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন দূতাবাস খোলে কিউবা। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করে । ১৯৬১ সালের পর থেকে গত ৫৪ বছর ধরে প্রতিবেশী দুই দেশ কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের কোন দূতাবাস ছিল না। ১৯৭৭ সাল থেকে তারা একটি ইন্টারেস্ট সেকশন নামের কূটনৈতিক দপ্তর চালিয়ে আসছিল।

১৪ আগস্ট, ২০১৫, কিউবায় আবার উড়লো মার্কিন পতাকা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ দূতাবাস চালু করেন। ১৯৬১ সালে যারা এই দূতাবাসে মার্কিন পতাকা নামিয়েছিলেন শেষবার তারাই আবার সেই পতাকা উত্তোলন করেন।জন কেরি গত ৭০ বছরে কমিউনিস্ট কিউবার মাটিতে পা রাখা প্রথম মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

অাভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন শেষ কথা বলে কোনো কথা নেই, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি অদ্ভুত সত্য। অাজকের শত্রু অাগামী দিনের বন্ধু। তদ্রুপ অাজকের বন্ধুও যেন অাগামী দিনের শত্রু।

অার একারণেই সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন অাজও ঠিক তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তির জন্য---

" স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে কিছু নেই, আছে স্থায়ী স্বার্থ।

অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত করে মার্কিন-কিউবা সম্পর্ক প্রবেশ করেছে নতুন অধ্যায়ে। ১৯৬২ সালে দুনিয়া কাঁপানো ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর তার প্রশমন হলেও হয়তো সমাপ্ত হয়নি বৈরিতার। তবে সমাপ্ত হোক বৈরিতার, সারা বিশ্ব হয়ে যাক পরস্পর পরস্পরের মিত্র। ভুল প্রমাণিত হোক পামারস্টোনের Oxymoron Theory.